অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কী?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (Interim Government) হলো একটি অস্থায়ী সরকারব্যবস্থা, যা সাধারণত একটি দেশের রাজনৈতিক সংকট, সরকার পরিবর্তন, বিপ্লব, সামরিক হস্তক্ষেপ, কিংবা নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে গঠিত হয়। এই সরকার সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পরিচালিত হয় এবং মূলত পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য কাজ করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বৈধ ভিত্তি কী?
এটি সাধারণত ডক্ট্রিন অব নেসেসিটি (Doctrine of Necessity) বা সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে গঠিত হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈশিষ্ট্য
✅ অস্থায়ী স্বরূপ – এটি একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গঠিত হয়।
✅ নিরপেক্ষতা – সাধারণত এটি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাবমুক্ত থেকে পরিচালিত হয়।
✅ সংবিধান ও আইনের সীমাবদ্ধতা – সংবিধান অনুসারে এর কার্যক্রম নির্ধারিত হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি "Doctrine of Necessity" বা "প্রয়োজনীয়তার নীতি" দ্বারা পরিচালিত হতে পারে।
✅ নির্বাচনকালীন ভূমিকা – এটি সাধারণত নির্বাচন পরিচালনা এবং একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালন করে।
বিশ্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উদাহরণ
✅ বাংলাদেশ (১৯৯০-১৯৯১) – স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পদত্যাগের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এটি দেশের প্রথম নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে পরিচিত।
✅ বাংলাদেশ (২০০৭-২০০৮) – রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, যা পরে নির্বাচন আয়োজন করে ২০০৮ সালে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করে।
✅ পাকিস্তান (১৯৫৮, 1971, 1999) – পাকিস্তানে একাধিকবার সামরিক শাসনের কারণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে।
✅ ইরাক (২০০3-2004) – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ইরাক আক্রমণের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
✅ মিশর (2013-2014) – গণবিক্ষোভ ও সামরিক অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক অবস্থান
বাংলাদেশের সংবিধানে সরাসরি "অন্তর্বর্তীকালীন সরকার" সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। তবে, বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী এই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
১. ১৯৯১ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
- ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
- ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার পর এই সরকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
২. ২০০৭ সালের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
- রাজনৈতিক সংকটের কারণে ২০০৭ সালে সেনাবাহিনী-সমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।
- এই সরকার দুই বছর ক্ষমতায় থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কারণ
✅ নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ প্রশাসন নিশ্চিত করা – ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাবমুক্ত একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন পরিচালনার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়।
✅ সংকটকালীন শাসন ব্যবস্থা চালু রাখা – রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক সংকট মোকাবিলা করার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
✅ নতুন সরকার গঠনের পথ সুগম করা – এটি সাধারণত একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বনাম তত্ত্বাবধায়ক সরকার
বিষয় | অন্তর্বর্তীকালীন সরকার | তত্ত্বাবধায়ক সরকার |
---|---|---|
মেয়াদ | অনির্দিষ্ট বা সংকট নিরসনের জন্য | সাধারণত ৯০ দিন |
প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি | বিশেষ পরিস্থিতিতে গঠিত হয় | সংবিধান অনুযায়ী নির্ধারিত |
নির্বাচনকালীন ভূমিকা | নির্বাচনের জন্য পরিবেশ তৈরি করে | নির্বাচন পরিচালনা করে |
সাংবিধানিক স্বীকৃতি | নেই বা অনির্ধারিত | সংবিধানের বিশেষ ধারা দ্বারা পরিচালিত |
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সুবিধা ও অসুবিধা
✅ সুবিধা:
✔ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে।
✔ নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করে।
✔ গণতান্ত্রিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সহায়তা করে।
❌ অসুবিধা:
✖ দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষমতার অপব্যবহার হতে পারে।
✖ অনেক ক্ষেত্রে এটি সেনাবাহিনীর প্রভাব বাড়াতে পারে।
✖ সংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
উপসংহার
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাধারণত সংকট নিরসন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য গঠিত হয়। এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে, এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই, এটি একটি অস্থায়ী এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা হওয়া উচিত যা সংবিধান ও জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধাশীল।